পটুয়াখালীর বাউফলের চরাঞ্চল অশান্ত হয়ে উঠেছে। প্রায় সাড়ে চার হাজার একর খাসজমি নিয়ে সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরাসরি ভূমিহীনদের নামে জমি একসনা লিজ দেওয়ার কথা থাকলেও তা না করে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে একসনা লিজ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে বাউফল উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে।
এছাড়াও মালিকদের জিম্মি করে তরমুজ চাষিদের কাছে চড়াদামে কৃষিজমি লিজ দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় বিএনপির একাধিক গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে যে কোনো সময় বাউফলের চরাঞ্চলে হতাহতের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
জানা গেছে, বাউফল উপজেলায় প্রায় সাড়ে চার হাজার একর খাসজমি রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে এসব জমি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে ভোগদখল করে আসছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কয়েকটি প্রভাবশালী মহল ওই খাসজমি দখলে নিয়ে চাষাবাদ শুরু করে। তারা তরমুজ চাষিদের কাছে একরপ্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে।
এছাড়াও কয়েকটি চরে জমির মালিকদের জিম্মি করে নামমাত্র মূল্যে শত শত একর জমি তরমুজ চাষিদের কাছে বিক্রি করেছেন কয়েকজন বিএনপি নেতা। কেশবপুর, ধুলিয়া, নাজিরপুর, কালাইয়া ও চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের একাধিক কৃষক জানান, চর ঈশান, চর নিমদি, চর ব্যারেট, চর ওয়াডেল, চরমমিনপুর, চর বাসুদেবপাশা, চর মোয়াজ্জেম, চর শৌলা ও চর ফেডারেশন এলাকায় বর্তমানে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ইতিমধ্যে চর ঈশানের জমি দখল নিয়ে দুই দল কৃষক কেশবপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক তসলিম উদ্দিন তালুকদার এবং পৌর বিএনপি নেতা মাসুমের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন।
জামাল মৃধা নামের এক ব্যক্তি গত ২৬ অক্টোবর পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কাছে চরাঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে তিনি তসলিম তালুকদার, রুহুল আমিন ও নাইমুজ্জামান তারেকসহ কয়েকজন বিএনপি নেতার নাম উল্লেখ করে বলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আমিনুল ইসলাম মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ওই বিএনপি নেতাদের মাধ্যমে ভূমিহীনদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া জমি লিজ দিয়ে চরাঞ্চলে অশান্ত পরিবেশ তৈরি করেছেন। আর এ কারণেই চরাঞ্চলে হতাহতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি জানতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আমিনুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এদিকে, বিগত মৌসুমে চর দখল নিয়ে বিরোধের জেরে বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে কালাইয়া ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি জসীম উদ্দিন তুহিনকে মারধর করা হয়। জসীম উদ্দিন তুহিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ও তার লোকজন চর শৌলা, চর মোয়াজ্জেম ও চর ফেডারেশন এলাকার শত শত একর জমি স্থানীয় মালিকদের জিম্মি করে একরপ্রতি ৫ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে পরে তরমুজ চাষিদের কাছে একরপ্রতি ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন।
এ বিষয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে চিহ্নিত কয়েক বিএনপি নেতারা তার ওপর হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত জখম করেন। চলতি বছরও ওই তিন চরে বিএনপি নেতা জসীম উদ্দিন তুহিন তার লোকজনের মাধ্যমে ভূমি মালিকদের কাছ থেকে প্রায় ৫০০ একর জমি নিয়ে তরমুজ চাষিদের কাছে বিক্রি করেছেন বলে জানা যায়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপি নেতা জসীম উদ্দিন তুহিন বলেন, “আমি চরের ধারে কাছেও যাই না। আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য একটি মহল প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে।”
এ প্রসঙ্গে বাউফলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সোহাগ মিলু বলেন, “চরাঞ্চলে উত্তেজনার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। চর মোয়াজ্জেম এলাকায় প্রায় ৪০০ একর খাসজমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিরসনের জন্য আমরা উভয় পক্ষকে ভূমি অফিসে ডেকেছি। এছাড়া সম্ভাব্য সহিংসতা এড়াতে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”











Leave a Reply